বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে (রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন, সুগন্ধা) “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র : ১০ই এপ্রিল ১৯৭১ এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম” শীর্ষক দুই দিনব্যাপী কনফারেন্সের দ্বিতীয় পর্ব মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ‘ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) কর্তৃক আয়োজিত এই কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন ভারত ও বাংলাদেশের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানসহ দেশ বিদেশের স্বনামধন্য আলোচকবৃন্দ।
বিলিয়ার অনারারী সেক্রেটারী এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই কনফারেন্সে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, আমাদের একটি বড় দূর্বলতা হচ্ছে আমরা আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করতে পারি নি। আমাদের অসংখ্য মানুষ, বিশেষত তরুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। কেউ কেউ আবার ভুলভাবে জানেন বা প্রচার করেন। আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে দীক্ষিত করে তুলতে হবে এবং তাদের ভেতরে ১০ই এপ্রিলের চিন্তা, ভাবনা ও চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আর এটা করতে না পারাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা। ১০ই এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে জাতীয়ভাবে প্রত্যাখ্যান করার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন সাংবাদিক আবেদ খাঁন।
সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সেক্রেটারী জেনারেল বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবিব তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলামের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সম্পর্কিত বস্তৃত আলোচনা জনসম্মুখে তুলে আনার উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র ভারতীয় সেনাবাহিনী নয় বরং সর্বভারতীয় সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ যেভাবে নৈতিক উপায়ে সহায়তা করেছেন তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, স্বাধীনতার ৫২ বছর পরেও বাংলাদেশ আসলে শত্রুমুক্ত হয়েছে কি না, তা বিশেষভাবে ভেবে দেখা দরকার। কেননা, বাংলাদেশের জন্মের অন্যতম ভিত্তি ছিলো অসাম্প্রদায়িক চেতনা। অথচ স্বাধীনতার ৫২ বছর পার হলেও আমরা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারিনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি এএইচএম শামছুদ্দীন চৌধুরী বলেন, ১৯৭১ সালের পরের প্রজন্ম বা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কী, অনেকেই আবার জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক মনে করেন।১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো, সেই অপশক্তি ৭৫ এর পরের ২১ বছর ধরে পাকিস্তান প্রেমিদের দ্বারা প্রলোভিত হয়েছে, নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম বা পরবর্তী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জানানো এবং সচেতন করে তোলার জন্য এ ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠান বার বার আয়োজন করা দরকার। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে বাঙালি জাতির জন্মসনদ উল্লেখ করে তিনি বলেন এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম আইন, এই আইনের মাধ্যমে আগের আইনগুলোর ধারাবাহিকতাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বেশ কিছু দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেশের জনগন থেকে আসে। তবে আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত না হলে সেই দেশকে আর স্বাধীন দেশ বলা যায় না। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনত পূর্ণতা পেত না। তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলেন, ভারত-সোভিয়েত সমঝোতা চুক্তি না হলে আমাদের বিজয় অর্জন করা আরও কঠিন হয়ে যেত। জেনারেল জিয়াউর রহমান এর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশে পাকাস্তানাইজেশন শুরু করে জেনারেল জিয়া। তিনি বলেন, সংবিধানে ধর্মকে অন্তর্ভূক্ত করার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ধর্ম রাজনীতি শুরু করেন। তিনি মন্তব্য করেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা উচিত, গোটা জাতিকে জানানো উচিত যেনো আর কোনো বিকৃতি না হয়। ভারতীয় ১৬ হাজার শহীদ সৈন্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং ভারতীয় সরকারকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিচারপতি মানিক তাঁর বক্তৃতা শেষ করেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবির সন্তান, রিসার্চ ইনিশিয়্যাটিভস বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হচ্ছে বাংলাদেশের ফাউন্ডেশনাল প্রিন্সিপল। তিনি দু:খ প্রকাশ করে বলেন যে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখনও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নি। তিনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলা ও ধরে রাখার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবির সন্তান, প্রজন্ম ‘৭১ এর সভাপতি আসিফ মুনির বলেন, বিশ্বের কোনো দেশে সাধারণত ইতিহাসকে রাজনীতিকরণ করা হয় না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এখনও পর্যন্ত নির্মোহভাবে রচিত হয় নি। এক্ষেত্রে প্রজন্ম ‘৭১ এবং বিলিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদানের জায়গাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটা করতে হলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত প্রয়োজন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উপর চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং ডকুমেন্টারী তৈরিসহ সম্ভাব্য সকল উপায়ে এটাকে ছড়িয়ে দেয়ার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন আসিফ মুনির।
শহীদ বুদ্ধিজীবির সন্তান অধ্যাপক ড. নুজহাত চৌধুরী বলেন, নারীর প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করতে হলে তাদের বিষয়ে চলমান নেতিবাচক মনোভাব ও সমালোচনা বন্ধ করতে হবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, দেশের মানুষ যদি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যথাযথভাবে জানত, তাহলে বাণিজ্যমেলায় পাকিস্তানি পণ্য কেনার জন্য এতটা ভীড় হত না। তাঁর মতে এটা খুবই আশঙ্কার বিষয় যে, আমাদের ধর্ম পরিচয় এবং জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে বৈপরিত্য তৈরি করে সাম্প্রদায়িক সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি; আর এটাই ছিলো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।
বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের সভাপতি হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্মের নিকট মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তথা যে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল তা তুলে ধরতে হবে। তিনি বাংলাদেশের জন্মসনদ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ এবং এর রচয়িতা ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম কর্তৃক উপস্থাপিত “বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মকথা” শীর্ষক বক্তৃতাটি বুকলেট আকারে প্রকাশ করার আহবান জানান। বাংলাদেশের জাতীয় চার নেতাসহ ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলামের জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী তোলেন মাওলানা জিয়াউল হাসান। তিনি বলেন, এর ফলে নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাহুত করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ৭১’এর সংবিধানের চেতনাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।
দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই কনফারেন্সে আলোচকদের অনেকেই ১০ই এপ্রিলকে “রিপাবলিক ডে” ঘোষণার দাবী জানান।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply